জাতীয় সংসদের নির্বাচনের আগে নয় গণভোট, দাবি খালেদার দলের! ফের বাংলাদেশে বিএনপি বনাম জামাত
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বৃহস্পতিবার বলেন, ‘‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট হতে হবে। এ বিষয়ে আমরা একমত। কিন্তু সংসদের নির্বাচনের আগে কোনও গণভোট হতে দেওয়া হবে না।’’
শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে মতবিরোধ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। বিশেষত, জাতীয় সংসদের নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট আয়োজনের দাবি ঘিরে। বৃহস্পতিবার মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জুলাই সনদ কার্যকরের জন্য জাতীয় সংসদের নির্বাচনের আগেই গণভোটের দাবি তুলেছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দল ওই বিষয়ে প্রকাশ্যে জামাতের বিরোধিতা করল।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বৃহস্পতিবার বলেন, ‘‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট হতে হবে। এ বিষয়ে আমরা একমত। কিন্তু সংসদের নির্বাচনের আগে কোনও গণভোট হতে দেওয়া হবে না।’’ প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদের নির্বাচন করানোর জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। কিন্তু জুলাই সনদ গণভোট নিয়ে এখনও কিছুই ঘোষণা করেননি ইউনূস। অন্তর্বর্তী সরকারের এই অবস্থান নিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে উষ্মা প্রকাশ করেন জামাতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মহম্মদ তাহের। তিনি বলেন, ‘‘সরকার ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের সময় ঘোষণা করেছে। ফেব্রুয়ারি কাছাকাছি চলে এসেছে, কিন্তু গণভোটের তারিখ ঘোষণা হচ্ছে না। নির্বাচনের আগে গণভোট করতে হবে।’’
এর পরেই তাহেরের খোলাখুলি হুঁশিয়ারি— ‘‘সোজা আঙুলে ঘি না-উঠলে আঙুল বাঁকা করব।’’ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোট না-করালে অন্তর্বর্তী সরকারের বিপদ বাড়বে বলেও হুমকি দেন তিনি। জামাতের আমির শফিকুর রহমানও দিনকয়েক আগে ‘প্রথমে গণভোট’ দাবি তুলেছিলেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে বিএনপির মহাসচিব সরাসরি জামাতের নাম না-করে বলেন, ‘‘কয়েকটি রাজনৈতিক দল বিভিন্ন দাবি নিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করছে। নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এটা জনগণ মেনে নেবে না। অনেক রক্তের বিনিময়ে ফ্যাসিস্ট শক্তির হাত থেকে আমরা স্বাধীন হয়েছি। একটা সুযোগ পেয়েছি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার। কোনও মহলের চক্রান্তে আমরা এই সুযোগ বিনষ্ট হতে দিতে পারি না।’’
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট জনবিক্ষোভের জেরে ক্ষমতা হারানোর দিন কয়েক আগে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেছিলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের পর ‘মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী’ এই রাজনৈতিক দলটির দাপট ক্রমশই বাড়ছে বাংলাদেশে। বস্তুত, তারা এখন মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ‘অন্যতম চালিকাশক্তি’ হিসাবে পরিচিত। সম্প্রতি ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী-সহ চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থীরা। ভরাডুবি হয়েছে বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের। এই পরিস্থিতিতে গণভোট নিয়ে জামাতের হুঁশিয়ারি ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন অশান্তির আশঙ্কা।চলতি বছরের ৫ অগস্ট ক্ষমতার পালাবদলের বর্ষপূর্তিতে ‘৩৬ জুলাই উদ্যাপন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন। ২৮ দফার ওই ঘোষণাপত্র হল ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের একটি দলিল, যার মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
হাসিনার আমলে ‘আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারের’ পাশাপাশি ওই সনদে সমালোচনা করা হয়েছে দুই সেনাশাসক, জিয়াউর রহমান (বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা) এবং হুসেন মহম্মদ এরশাদের (জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা) জমানারও। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে ঘোষণার কথাও বলা হয়েছে ওই সনদে। যদিও তার রূপায়ণের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে এখনও মতবিরোধ রয়েছে। জামায়াত সই করলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের একাংশের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখনও সনদে স্বাক্ষর করেনি।
গত বছরের অগস্টে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ঘিরে দানা বাঁধা প্রবল জনবিক্ষোভের জেরে প্রধানমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিয়ে বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন হাসিনা। সেই আন্দোলনের অন্যতম ‘মুখ’ নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনত আবদুল্লার মতো ছাত্রনেতারা পরবর্তী কালে এনসিপি গড়েন। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পাশাপাশি জামায়াতে নেতৃত্বের সঙ্গেও নাহিদদের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। ইতিহাস বলছে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে পাকিস্তান সেনার পক্ষে কাজ করেছিলেন। রাজাকার, আল বদর ঘাতকবাহিনীর সদস্য হিসাবে গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে একাধিক জামায়াত নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে। হাসিনার জমানায় কয়েক জনের সাজাও হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। অন্য দিকে, খালেদার স্বামী তথা বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান পাক সেনার প্রথম বাঙালি অফিসার হিসাবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের মতোই জিয়াও স্বাধীনতার অন্যতম ঘোষক বলে পরিচিত।
0 মন্তব্যসমূহ